শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৯:৩১ পিএম, ২০২৬-০৮-০৩
সব কবিতা শব্দ দিয়ে শুরু হয় না; কিছু কবিতা শুরু হয় নীরবতা দিয়ে। কিছু কবিতা ভাষায় নয়, ভাষাহীনতার ভেতর জন্ম নেয়। উচ্চারণের আগেই যেসব শব্দকে ঘিরে ফেলে ভয়, নজরদারি, ক্ষমতা ও আত্মগোপনের সংস্কৃতি, সেসব শব্দই একসময় কবিতার আশ্রয় খোঁজে। তখন কবি কেবল সৌন্দর্যের নির্মাতা নন; তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের অন্তর্লিখনকার, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এবং বিবেকের গোপন ভাষ্যকার। সারাফ নাওয়ারের ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ এমনই এক কাব্যগ্রন্থ, যেখানে কবিতা ব্যক্তিগত আবেগের সীমানা অতিক্রম করে রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, প্রেম, মৃত্যু, প্রকৃতি এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটকে একই বয়ানে ধারণ করেছে।
বাংলা কবিতার সমকালীন পরিসরে এমন কাব্যগ্রন্থ খুব বেশি প্রকাশিত হয় না, যার নামই পাঠককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ তেমনই একটি ব্যতিক্রমী নাম। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক এবং বাক্স্বাধীনতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি বহন করে। কিন্তু কবি এই অনুচ্ছেদকে কেবল একটি আইনি পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং এটিকে সময়ের নৈতিক সংকট, মানুষের নীরবতা, ভয়, প্রতিবাদ এবং স্বাধীন চেতনার প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। ফলে বইটির শিরোনামই এর দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ করে।
কবি সারাফ নাওয়ার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮১ সালের ১৭ ডিসেম্বর। তাঁর পৈত্রিক নিবাস চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে। সমকালীন বাংলা কবিতায় তিনি এমন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, যিনি সরাসরি বক্তব্যের পরিবর্তে প্রতীক, চিত্রকল্প এবং ব্যঞ্জনাময় ভাষার ওপর অধিক আস্থা রাখেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়, তেমনি নাগরিক সংকটও ব্যক্তির অন্তর্জগতের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে তাঁর কবিতা পাঠককে কেবল অনুভবের নয়, চিন্তারও ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।
এই কাব্যগ্রন্থে সংকলিত ৫৬টি কবিতার শিরোনামই কবির চিন্তার বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। ফরেস্ট গেইট, বৃক্ষ সকাল, ছায়াঠোঁট, পাসওয়ার্ডের যুগে, পূর্বপুরুষের অট্টহাসি, সভ্যতার স্নান, হৃদয়গালিচা, আদি চাষাবাদ, বৃষ্টির অনুবাদ, সিরিয়ার মুখ, উদ্বাস্তু সময়, চট্টগ্রাম স্টেশন, মানুষগুলো আধখানা—প্রতিটি শিরোনাম যেন একটি স্বতন্ত্র কাব্যদর্শনের ইঙ্গিত বহন করে। কোথাও প্রকৃতি, কোথাও ইতিহাস, কোথাও প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা, কোথাও যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়, আবার কোথাও ব্যক্তিমানসের গভীর নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে গ্রন্থটি বহুমাত্রিক ভাবনার এক সমৃদ্ধ ভুবন নির্মাণ করেছে।
গ্রন্থের শিরোনাম কবিতা ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ নিঃসন্দেহে পুরো বইয়ের কেন্দ্রবিন্দু। কবিতার শুরুতেই উচ্চারিত হয়েছে—“কলমের হাতে হাতকড়া, নিরুপায় ৩৯ অনুচ্ছেদ…”। এই একটি চিত্রকল্পই কবিতাটিকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি থেকে বের করে রাষ্ট্র, নাগরিক ও লেখকের সম্পর্কের জটিল বাস্তবতায় নিয়ে যায়। এখানে হাতকড়া কেবল একজন মানুষের নয়; এটি স্বাধীন চিন্তার ওপর আরোপিত অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
এরপর কবি লিখেছেন—“সংবিধানের ডালে বসে না কোকিল, ময়না, দোয়েল।” এই চিত্রকল্প বাংলা কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সংবিধান সাধারণত ন্যায়, অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতীক; কিন্তু সেই ডালে যদি পাখি না বসে, তবে সেটি কেবল একটি আইনি কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে, জীবনের স্পন্দনে নয়। কবি অত্যন্ত সংযত ভাষায় বাস্তবতা ও আদর্শের দূরত্বকে এভাবেই তুলে ধরেছেন।
কবিতার আরেকটি শক্তিশালী উচ্চারণ—“আজও পারেনি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে ষোল কোটি লোক।” এখানে অনিদ্রা ব্যক্তিগত নয়; এটি সমষ্টিগত। মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি একটি জাতীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। কবি সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন না; বরং কাব্যিক প্রতীকের মাধ্যমে সেই অনুভূতিকে নির্মাণ করেন। এ কারণেই কবিতাটি স্লোগানে পরিণত হয় না; বরং দীর্ঘস্থায়ী শিল্পে রূপ নেয়।
এই কাব্যগ্রন্থের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে প্রতিবাদ কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং অন্তঃসলিলা। কবি ঘোষণা দেন না; তিনি ইঙ্গিত করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন না; বরং এমন সব চিত্রকল্প নির্মাণ করেন, যা পাঠককে নিজের ভেতরেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই সংযমই তাঁর কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক শক্তি।
প্রথম পাঠেই বোঝা যায়, ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ কোনো একক বিষয়ের কাব্যগ্রন্থ নয়। এটি একই সঙ্গে সময়ের দলিল, মানুষের অন্তর্জগতের মানচিত্র এবং স্বাধীন চেতনার এক প্রতীকী ভাষ্য। আর এই কারণেই বইটি পাঠকের কাছ থেকে কেবল আবেগ নয়, মনোযোগ, ধৈর্য এবং পুনঃপাঠেরও দাবি জানায়।
শিরোনাম কবিতা ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ যেমন এই কাব্যগ্রন্থের দার্শনিক কেন্দ্র, তেমনি ‘পরিক্রমা’ কবিতাটি গ্রন্থের জীবনদর্শনের অন্যতম ভিত্তি। কবি লিখেছেন—
“অপমান অনুগ্রহ, গ্রহণ বিসর্জন
প্রেমে-ঘৃণায়, বহুলমৃত্যু পরিক্রমায়
বদলে যায় চলার রঙ।”
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই মানুষের জীবনচক্রের বহুমাত্রিক রূপ ধরা পড়ে। জীবন এখানে সরলরৈখিক নয়; বরং এক অন্তহীন আবর্তন। অপমান ও অনুগ্রহ, প্রেম ও ঘৃণা, পাপ ও পুণ্য—সবকিছু মিলেই মানুষের অস্তিত্ব নির্মিত হয়। কবির কাছে জীবন কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়; বরং ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আত্ম-উন্মোচনের একটি যাত্রা।
কবিতাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ঈশ্বরচেতনা। “বেদনা-আলোয় জন্ম নেওয়া ঈশ্বরের চোখে অজস্র প্রেমের সমাহার”—এই উচ্চারণে ঈশ্বর কোনো ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতীক নন; তিনি মানবিক অনুভূতির অন্তর্গত এক আলোকরেখা। বেদনা এখানে ধ্বংসের কারণ নয়; বরং ভালোবাসা ও আত্মবিকাশের উৎস। আধুনিক বাংলা কবিতায় এই ধরনের দার্শনিক সংযম খুব সহজে চোখে পড়ে না।
অন্যদিকে ‘অন্ধনদী’ কবিতায় সারাফ নাওয়ার স্মৃতি, বিচ্ছেদ ও অপেক্ষাকে এক স্বপ্নময় কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। কবিতার শুরুতেই তিনি লেখেন—
“কবির আঁতুড়ঘর পাড়ি দিয়ে
তোমার প্রতিবিম্বরা দাঁড়িয়ে থাকে
ধূপগন্ধে সদ্যজাত কবিতার ছায়াতলে…”
এখানে ‘কবির আঁতুড়ঘর’ আসলে সৃষ্টির জন্মভূমি, আর ‘প্রতিবিম্ব’ মানুষের স্মৃতি ও অনুপস্থিতির রূপক। কবি সরাসরি কোনো প্রেমের গল্প বলেন না; বরং এমন এক আবহ নির্মাণ করেন, যেখানে অনুপস্থিত মানুষও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কবিতার শেষ পঙ্ক্তি—“দু'টো জানালায় তুমি আমি দেখি একখানা চাঁদ”—বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও এক অদৃশ্য ঐক্যের প্রতীক। এই চিত্রকল্প দীর্ঘদিন পাঠকের মনে থেকে যায়।
গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘স্বাক্ষর’। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্মৃতির কবিতা হলেও গভীরে এটি সময়, পরিচয় এবং অস্তিত্বের দলিল। কবি লিখেছেন—
“একই কালিতে কলমের
কত রকম ফের।”
মাত্র দুটি পঙ্ক্তিতে তিনি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ইতিহাস এবং পরিচয়ের বহুত্বকে তুলে ধরেছেন। একই ভাষা, একই সময়, একই ইতিহাস—তবু প্রত্যেক মানুষের স্বাক্ষর আলাদা। আবার “তোমার স্বাক্ষর গোপনে পড়ি”—এই উচ্চারণ ব্যক্তিগত স্মৃতিকে এমনভাবে সার্বজনীন করে তোলে, যেখানে প্রত্যেক পাঠক নিজের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন খুঁজে নিতে পারেন। শেষের “বৃন্দাবনে আসে না বসন্ত” পঙ্ক্তি অপূর্ণতা ও অনুপস্থিতির এক গভীর প্রতীক হয়ে ওঠে।
আয়তনে ছোট হলেও ‘নির্ঘুম’ কবিতাটি এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম উজ্জ্বল সংযোজন। কবি লিখেছেন—
“রাতের যাদুঘরে
প্রেমিকের হৃৎপিণ্ড
দর্শনার্থীর কানে
কি কথা বলে!”
‘রাতের যাদুঘর’—এই চিত্রকল্পই কবিতাটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। এখানে রাত নিছক সময় নয়; এটি স্মৃতি, বেদনা এবং আত্মসংলাপের এক জাদুঘর। আর শেষের উচ্চারণ—“নির্ঘুমতা আমাকে বাঁচায়”—আধুনিক মানুষের মানসিক অবস্থার এক গভীর ব্যাখ্যা। যে অনিদ্রা সাধারণত যন্ত্রণা হিসেবে বিবেচিত হয়, কবি সেটিকেই আত্মসচেতনতার আলোয় নতুন অর্থ দিয়েছেন।
এই কাব্যগ্রন্থে কেবল পূর্ণাঙ্গ কবিতাই নয়, অনেক শিরোনামও স্বতন্ত্র প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যেমন ‘পাসওয়ার্ডের যুগে’ শিরোনামটি প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ রূপক। মানুষ আজ অসংখ্য পাসওয়ার্ড দিয়ে তথ্য সুরক্ষিত রাখলেও, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও মানবিকতার দরজাগুলো ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। এই একটি শিরোনামই সমকালীন জীবনের গভীর সংকটকে ইঙ্গিত করে।
একইভাবে ‘সভ্যতার স্নান’ শিরোনামে লুকিয়ে আছে আত্মসমালোচনার আহ্বান। সভ্যতা কি কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নাম, নাকি মানবিক বিবেকেরও বিকাশ? কবি যেন এই মৌলিক প্রশ্নটিই পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। আর ‘মানুষগুলো আধখানা’ শিরোনামটি সমকালীন মানুষের খণ্ডিত অস্তিত্বের শক্তিশালী রূপক। ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার রাজনীতি ও আত্মকেন্দ্রিকতার চাপে মানুষ যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে; শিরোনামটি সেই অপূর্ণতার ভাষা।
এইসব কবিতা ও শিরোনাম পাঠ করলে স্পষ্ট হয়, সারাফ নাওয়ার কেবল অনুভূতির কবি নন; তিনি সময়ের অন্তর্গত সংকটকে নান্দনিক প্রতীকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর কবিতায় প্রেম যেমন আছে, তেমনি প্রতিবাদও আছে; কিন্তু কোনোটিই সরাসরি নয়। সবকিছুই শিল্পের সংযমে, ব্যঞ্জনার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংযমই তাঁর কাব্যভাষাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
সারাফ নাওয়ারের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর প্রতীক নির্মাণের ক্ষমতা। তিনি দৃশ্যমান বাস্তবতাকে সরাসরি বর্ণনা করার চেয়ে তার অন্তর্নিহিত অর্থকে চিত্রকল্প ও ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে তাঁর কবিতায় বৃক্ষ, নদী, বৃষ্টি, চাঁদ কিংবা পাখি কেবল প্রকৃতির উপাদান হয়ে থাকে না; এগুলো মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ভয়, আশা এবং অস্তিত্বের বহুমাত্রিক প্রতীকে পরিণত হয়। এই বহুস্বরিক অর্থস্তরই তাঁর কবিতাকে পুনঃপাঠের দাবি জানায়।
গ্রন্থের সূচিপত্রের দিকে তাকালেই কবির বিষয়বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘বৃক্ষ সকাল’, ‘বৃক্ষবৃত্তান্ত’, ‘ফরেস্ট গেইট’, ‘বৃষ্টির অনুবাদ’—প্রকৃতিকে তিনি কেবল নান্দনিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং মানুষের অন্তর্জীবন ও সময়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন। আবার ‘সিরিয়ার মুখ’ ও ‘উদ্বাস্তু সময়’ শিরোনাম দুটি বিশ্বমানবতার ক্ষত, যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের বেদনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে ‘চট্টগ্রাম স্টেশন’, ‘নিজস্ব ঠিকানা’ কিংবা ‘মানচিত্রের সীমানা’ নাগরিক জীবন, পরিচয়ের সংকট এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার অন্তর্নিহিত প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
প্রেমও এই কাব্যগ্রন্থে একরৈখিক নয়। ‘হৃদয়গালিচা’, ‘না বলা আলিঙ্গন’, ‘প্রাক্তন কিশোরী’, ‘পুলক’ কিংবা ‘আমি আর ছায়া’—এসব শিরোনাম ইঙ্গিত করে যে, কবির কাছে প্রেম মানে কেবল সম্পর্কের উষ্ণতা নয়; বরং স্মৃতি, অনুপস্থিতি, সময় এবং আত্ম-অনুসন্ধানের দীর্ঘ পথচলা। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলোও শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বের প্রশ্নে এসে মিশে যায়।
ভাষা ও কাব্যনির্মাণের দিক থেকে সারাফ নাওয়ার সমকালীন বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্র প্রবণতার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর কবিতায় প্রতীক, চিত্রকল্প, গদ্যকবিতার স্বর এবং অস্তিত্ববোধের যে সমন্বয় দেখা যায়, তা বাংলা আধুনিক কবিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গেও একটি সংলাপ তৈরি করে। তবে এই সংলাপ কোনো নির্দিষ্ট কবির অনুসরণ নয়; বরং সমকালীন কাব্যভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং দার্শনিক ভাবনাকে তিনি যে ভাষায় রূপ দিয়েছেন, সেখানে তাঁর নিজস্ব কাব্যভঙ্গি ও স্বাতন্ত্র্যই অধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শব্দের সংযম। তিনি অল্প শব্দে গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেন। অনেক সময় একটি মাত্র চিত্রকল্প বা একটি পঙ্ক্তিই পুরো কবিতার ভাবকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতাকে তাৎক্ষণিক আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। ফলে পাঠককে শুধু কবিতা পড়লেই হয় না; কবিতার ভেতরে প্রবেশ করতে হয়, থামতে হয়, ফিরে যেতে হয়, পুনরায় ভাবতে হয়।
তবে এ কথাও বলা যায়, গ্রন্থটির কিছু কবিতায় প্রতীক ও বিমূর্ততার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে প্রথম পাঠে সব অর্থ উন্মোচিত হয় না। মনোযোগী ও ধীর পাঠের মধ্য দিয়েই কবিতাগুলোর অন্তর্নিহিত স্তরগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। আধুনিক কবিতার পাঠরীতি বিবেচনায় এটি দুর্বলতা নয়; বরং কবির সচেতন শিল্পকৌশল।
শেষকথা: বাংলা কবিতার সমকালীন পরিসরে ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ এমন একটি কাব্যগ্রন্থ, যা সহজ উচ্চারণের পরিবর্তে ভাবনার গভীরতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এখানে ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র থেকে সমগ্র মানবসভ্যতার দিকে কবির দৃষ্টি ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। প্রেম, প্রতিবাদ, স্মৃতি, ইতিহাস, যুদ্ধ, প্রকৃতি ও মানবিক বোধ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এক বহুমাত্রিক কাব্যভুবন।
গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রতীকী ভাষা ও মননশীল নির্মাণ। একই সঙ্গে এটি পাঠকের কাছে ধৈর্য ও মনোযোগ দাবি করে। যারা কবিতায় কেবল আবেগ নয়, চিন্তারও অনুসন্ধান করেন, তাঁদের জন্য ‘৩৯ অনুচ্ছেদ’ নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বইটি শেষ পৃষ্ঠায় এসে থেমে যায় না; বরং তার প্রতীক, নীরবতা এবং প্রশ্নগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকের ভেতরে অনুরণিত হতে থাকে। একজন কবির সার্থকতা হয়তো সেখানেই—যেখানে কবিতা পাঠ শেষ হলেও ভাবনার যাত্রা শেষ হয় না।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জুলাই— কোনো ক্যালেন্ডারের মাস নয়; রাষ্ট্রের বুকের ভেতর জমে থাকা বজ্রের মতো এক দীর্ঘ কম্পন। রা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : নক্ষত্রেরও পূর্বের যে নিবিড় অন্ধকার, সেখানেই শব্দ খুঁজে পায় তার আদিম অনুরণন। একজন কবি শুধু পঙ্...বিস্তারিত
আমাদের সাহিত্য : : ---- হিলারী হিটলার আভী চিতাযজ্ঞে ধ্বংস হচ্ছে আশা ভালবাসা সোনালি জীবন ও যৌবন আর বাইপাস পারবে ন...বিস্তারিত
আমাদের সাহিত্য : : আবদুল্লাহ মজুমদার কোরবানির বিধান রাখি মনে ঈমানি জোরে নিসাব থাকলে ওয়াজিব হয় মুমিনের ঘরে ঈদের ন...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : মানবতা, সাহিত্য ও সমাজসেবার অনন্য মিশেলে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন নন্দিত সংগঠক, লে...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : শফিক হাসান : দুপুরে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সঙ্গে মৃদু ঠুসঠাস বজ্রপাতও। রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত জনজী...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited